হুমায়ুন কবির জুশান; উখিয়া :
মাত্রাতিরিক্ত শত শত ভারি যানবাহন প্রতিনিয়ত ভোর থেকে রাত অবদি চলাচল করছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক দিয়ে। রোহিঙ্গাদের কারণে ত্রাণের গাড়িগুলো ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তার ওপর এনজিওর বিলাস বহুল গাড়ি এবং সড়কে গণপরিবহনের পাশাপাশি টমটম,সিএনজির অদক্ষ মাদকসেবি চালকের কারণে শেষ হয়ে যাচ্ছে আগামীর স্বপ্ন। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ। গত এক মাসে শুধু কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সিরাজুলহক বিএ, সদস্য সিরাজুল হক ডালিমসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, শরণার্থী শিবিরে কর্মরত এনজিও কর্মী, গৃহবধূ, রোহিঙ্গা শিশুসহ অনেকের।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কেও আছে মৃত্যুর লম্বা সারি। পুলিম ম্যানেজ করে ডাম্পার, বটবটি, টমটম, সিএনজি, স্পেশাল বাস, ট্রাক, সী-লাইন, কক্সলাইন, সোহাগ, সেন্টমার্টিন সার্ভিস, শ্যামলী, সৌদিয়া, এস আলমসহ গণপরিবহনের বেপরোয়া গতিতে জীবনহানি নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। অসংখ্য দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায় নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় নড়েচড়ে বসেছেন, প্রসাশন ও গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।
সম্প্রতি উখিয়া-টেকনাফের সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ নিয়ে কথা হয়, প্রশাসন, মালিক-শ্রমিক ও সুশীল সমাজের সাথে। অধিকাংশই বলেছেন, বাসের ফিটনেস, চালকের মাদকাসক্তি, ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতা ও গাফিলতির কথাও বলেছেন। আবার গাড়ি চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইলে কথা বলাকেই দায়ি করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সিরাজুল হক বিএ, এর মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সামাজিক সংগঠন সূর্যোদয় সংঘের সভাপতি নুরুল আলম বলেন, এটার কারণও ছিল কিন্তু একই। সিএনজি চালক সরওয়ার বলেন, আমি ড্রাইভার হিসেবে মালিকের ভাড়া, রাস্তার চাঁদা, তেল বা গ্যাস খরচসহ বাদ দিয়ে যা থাকবে তা আমার নিজের। চুক্তির টার্গেট অনুযায়ী মালিককে টাকা দিতে না পারলে পরের দিন গাড়ি পাওয়ার সুযোগ নেই। দূরপালার বাস চালক হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, চালক ও হেলপারের দোষ পায়ে পায়ে। অথচ দেশের রাস্তাঘাটের যে অবস্থা তাতে শুধু চালকদের দোষ দেওয়া ঠিক না।
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের জহির নামের আরেক চালক বলেন, উখিয়া কুতুপালং হতে থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পর্যন্ত আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সহিত গাড়ি চালাতে হয়। কারণ, রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুরা হঠাৎ করে রাস্তা পার হতে তারা হুট করে দৌড় দিয়ে গাড়ির নিচে পড়ছে, আর তখনই দোষ হচ্ছে চালকের। বলা হচ্ছে সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তার অভিমত, এসব ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া উচিত।
পরিকল্পিত উখিয়া চাই এর আহবায়ক সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, সরকার ট্রাফিক পুলিশকে দায়বদ্ধ করতে পারেনি। তাদের কার্যক্রম কোনোভাবেই জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়নি। সড়কের পাশে প্রতিটি বিদ্যালয়ের সামনে ট্রাফিক পুলিশ থাকা প্রয়োজন। এখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা অনিরাপদ জীবন যাপন করছে। শুধু আলাহর রহমতের কারণে ছাত্রছাত্যীসহ আমরা কোনোমতে বেঁেচ ঘরে ফিরতে পারছি।
অন্যদিকে অদক্ষ চালকও বেশি বলে উলেখ করে তিনি আরো বলেন, চালকদের প্রশিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। সার্বিক অবস্থার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার।
উখিয়া-টেকনাফে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল দীর্ঘ হওয়ার পরও পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো ঘাতক চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে জোরালো কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিন দিন। ফলে সড়ক পথের নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক এনজিও কর্মী বাবলু বলেন, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে তার আরেক এনজিও সহকর্মীসহ তিনজন এক সাথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সড়ক পথের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চালকদের সচেতনতা বাড়াতে কাউন্সিলিং করা দরকার। সচেতন এক অভিভাবক মোসলেহ উদ্দিন বলেন, বেপরোয়া পরিবহন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুব্ধে ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রবাসী ছাত্রদলের উখিয়া উপজেলার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুলফিকার আলী ভূট্রো ও আরেক প্রবাসী আবুল হশেম বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে উখিয়া এখন বিশ্বের কাছে একটি পরিচিত নাম। এই সড়ক এখন ঢাকার গাবতলি, সায়েদাবাদকেও হার মানিয়েছে। হাজার হাজার গাড়ি, দীর্ঘ যানজটের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখানে হাজার কোটি টাকার এনজিওরা কাজ করছেন। জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিকল্প রাস্তার প্রয়োজন। এখানে ১০ ভাগ বেশি ট্রাফিক আইন অমান্য করা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের জনবল বাড়ানো দরকার বলে তারা মনে করছেন।
সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সচিব গণমাধ্যম কর্মী শফিক আজাদ বলেন, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুদিন আগে উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মোহাম্মদ রিদুয়ান বাবু মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন। ট্রাফিক পুলিশেরও কোনো তৎপরতা নেই। পূর্বাঞ্চলীয় ঐক্য পরিষদের আহবায়ক সাংবাদিক হানিফ আজাদ বলেন, বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, প্রশিক্ষণ ছাড়াই ড্রাইভিং, মাদকাসক্তিসহ চলন্ত অবস্থায় চালকদের মোবাইল ব্যবহারই অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.