
সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রীকে মারধর ঘটনায় বিক্ষোভ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের এক ছাত্রীকে মারধর করেছেন ছাত্রলীগের এক নেত্রী। এই ঘটনায় হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। হলের সভাপতি ইশরাত জাহান এশা তিন দিন ধরেই ছাত্রীদের মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
১০ এপ্রিল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।
এই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। আহত ছাত্রীর রক্তাক্ত পা, স্যান্ডেল ও ফ্লোরের বিভিন্ন ছবি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে অনেকেই এর প্রতিবাদ জানান। বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা ঘটনাস্থল থেকে ফেসবুকে লাইভ করেন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। এই ঘটনায় অন্যান্য হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ছাত্রীরা বিক্ষোভ করলে রাত ১টার দিকে হলে যান প্রাধ্যক্ষ সাবিকা রেজওয়ানা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর একেএম গোলাম রাব্বানী। এর দেড় ঘণ্টা পর প্রক্টর জানান, এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হল কর্তৃপক্ষ।

হল সভাপতি ইশরাত জাহান এশা। ছবি : সংগৃহীত
ইশরাত জাহান এশা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের অনুসারী। মারধরের ঘটনায় এশাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনে হল থেকে কারা যাচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে রাতে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয় ইশরাত জাহান এশার নেতৃত্বে। মঙ্গলবার রাতেও কয়েকজনকে মারধর করা হয়। এ সময় চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রীর পা কেটে গেলে রক্তক্ষরণ হয়। এ সময় তার চিৎকার শুনে সাধারণ ছাত্রীরা বাইরে বের হয়ে আসেন। এশাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং স্লোগান দিতে থাকেন। ছাত্রলীগের হল সভাপতিকে এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা মারধরও করেন।
এ বিষয়ে ইশরাত জাহান এশার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মারধরের শিকার হওয়া ওই ছাত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের মারধর করে। হলের সভাপতি ইশরাত জাহান এশা আপু প্রতিদিন মেয়েদের মারে। তিন দিন ধরে প্রোগ্রাম হচ্ছে, আমরা গেছি। আমাদের জিজ্ঞাসা করে আমরা কই গেছি, কেন গেছি। আমাদের তো আর সবার সামনে মারে নাই। সেকেন্ড ইয়ারের একটা মেয়েকে মারছে। থাপ্পর মারছে, মাথায় পানি দিতে হইছে। মেয়েটা পা পর্যন্ত ধরছে। কষ্ট এটাই, ম্যাডামরা আমাদের দায়িত্ব নিতে পারে নাই। আমরা তো অসহায় হয়েই হলে উঠি। এগুলা আমাদের চুপচাপ দেখতে হইছে। কোনো ব্যবস্থা নাই। কালকেও মেয়েদের মারছে। তিন চারটা মেয়েকে মারছে।’
খবর পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রাব্বানী সুফিয়া কামাল হলে গেলে ছাত্রীদের তোপের মুখে পড়েন। প্রায় দেড় ঘণ্টা তিনি হলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর হল প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘ইশরাত জাহান এশাকে হল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
রাতেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে ইশরাত জাহান এশাকে বহিষ্কার করা হলো।
এই ঘটনার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলে। বিজয় একাত্তর হলের গেটে তালা দিলে ছাত্ররা তালা ভেঙে বাইরে বের হয়ে আসেন।
এর আগে রবিবার রাতেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর। ওই রাতভর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পা কেটে যাওয়া শিক্ষার্থীর বক্তব্য
৮ এপ্রিল রবিবার শাহবাগ মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের হটানোর জন্য রাত ৮টার দিকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ও লাঠিচার্জ শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এ ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শাহবাগ-টিএসসি এলাকা। পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
৯ এপ্রিল সোমবার সকালে আবারও রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। পরে সচিবালয়ে বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। সে সময় সেতুমন্ত্রী তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে আগামী ৭ মে পর্যন্ত এ আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় কমিটি।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় দুটি ভাগে ভাগ হয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্তে একটি অংশ ফিরে যান, অপর অংশ রাজু ভাস্কর্যের সামনেই থেকে যান। পরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কারণে মঙ্গলবারের কর্মসূচি ঘোষণা করে এই অংশটিও ফিরে যান এবং সকালে আবারও একত্রিত হন তারা।
মঙ্গলবার আন্দোলনকারীদের বিভক্ত হওয়া দুই অংশ আবারও এক হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সমাধান না আসা পর্যন্ত তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই আন্দোলনে বেশিরভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আন্দোলন জোরালো হওয়ার পর থেকেই অস্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল, বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করছেন। মঙ্গলবার রাতে সুফিয়া কামাল হলের ঘটনায় তা স্পষ্ট হলো।
সূত্র:ইরফান এইচ সায়েম-priyo.com;ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.