
নজরুল ইসলাম :
২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির হাইকমান্ড ‘এক নেতার এক পদ’ কার্যকরে সিদ্ধান্ত দিলেও প্রভাবশালী নেতাদের কাছে তা পাত্তা পাচ্ছে না। কারাবন্দি হওয়ার আগে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনিও দলের পুনর্গঠনে কাক্সিক্ষতভাবে সফল হতে পারছেন না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা ও মহানগরসহ তৃণমূল কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত দেন। শুধু বিএনপিই নয়, অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে কৃষক দল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দলের তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এরই মধ্যে কাজ শেষ না হলেও অনেক কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে বেহাল শ্রমিক দল, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাংগঠনিক কাজে হাত দিতে পারছেন না হাইকমান্ড। এ প্রসঙ্গে দলের প্রভাবশালী দুই নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, মহাসচিবসহ অনেকে সিদ্ধান্ত মেনে এক পদ রেখে অন্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু যারা দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মানছেন না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দলের গঠনতন্ত্রের ১৫ (খ) ধারায় বিশেষ বিধান : দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি কিংবা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের কোনো সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোনো কর্মকর্তা এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক দলের অন্য কোনো পর্যায়ের কমিটিতে কর্মকর্তা নির্বাচিত হতে পারবেন না।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কাজ চলছে। কোথাও কোনো অভিযোগ থাকলেও তা দেখতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে একাধিক টিম কাজ করছে। সবাইকে বুঝতে হবে মামলা-হামলাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হচ্ছে। এ কারণে হয়তো কিছু কমিটির মেয়াদ ১০-১৫ দিন পার হয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদল, ড্যাবের কমিটি করেছি। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে। এ ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে করার প্রক্রিয়া চলছে। যুবদলের এক নেতা জানান, তারেক রহমান যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নতুন করে কমিটির ৪০ শতাংশ ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের পদায়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যুবদলের একটি অংশ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যার কারণে যুবদলের কমিটি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলের ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী একই সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার সভাপতি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমান ঝিনাইদহ জেলার আহ্বায়ক, যুগ্ম মহাসচিব মুজিবুর রহমান সরোয়ার বরিশাল মহানগর সভাপতি, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী জেলার সভাপতি, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি, যুগ্ম আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী চট্টগ্রাম উত্তরের সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা মহানগরের সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গাজীপুরের সভাপতি। এসব নেতার এক পদ রেখে অন্য পদ ছেড়ে দিতে খালেদা জিয়া বেশ কয়েকবার কঠোর নির্দেশও দিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো নির্দেশেই কাজ হচ্ছে না। এসব নেতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তাদের ইচ্ছার বাইরে কেউ ওই এলাকায় স্বাধীনভাবে দলীয় কোনো কর্মকান্ড করতে পারেন না। সম্প্রতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মনির হোসেন তারেক রহমানকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘গত ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় কমিটি মিলিয়ে ২০০২ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। এর পর আর কোনো কমিটিতে স্থান হয়নি।
কোনো পদ-পদবি ছাড়া জুনিয়রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কষ্টকর। আমাকে যে কোনো পদ্ধতিতে আটকাতে ফজলুল হক মিলন ভাই একাই বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, গাজীপুর জেলা সভাপতি, কালীগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি পদে আছেন। কালীগঞ্জ পৌর বিএনপির কমিটি না থাকলেও পদাধিকার বলে তিনিই সভাপতি। কেন্দ্রীয় অথবা স্থানীয় কোথাও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি না। গাজীপুরের বিএনপি মিলনকেন্দ্রিক এবং জিম্মি। আপনি ছাড়া আমার কোনো আশা নেই। কোনো দায়িত্ব দিলে ঈমানি দায়িত্ব মনে করব কথা দিলাম।’
নির্বাচনের পর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের তৃণমূল পুনর্গঠনে দায়িত্ব দেন তারেক রহমান। এসব দায়িত্বপ্রাপ্রাপ্ত নেতার বিরুদ্ধেও এরই মধ্যে নানা অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী নেতাদের পাশাপাশি বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে বরিশালের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুকে এবং ময়মনসিংহের দায়িত্বে যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে। সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এ প্রতিবেদককে বলেন, ম্যাডামের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যেভাবে দলের হাল ধরেছেন এটা প্রশংসনীয়। তিনি সাহসের সঙ্গে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করছেন। সমস্যা যেটাই হোক সমাধানও হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে ১৯টির আহ্বায়ক কমিটি এবং ৯টির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সময় বলা হয়, যারা আহ্বায়ক অথবা সদস্য সচিব হয়েছেন তারা কেউ জেলা-মহানগর কাউন্সিলে সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হতে পারবেন না।
বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রতিবেদককে বলেন, এ কারণে আহ্বায়ক কমিটির নেতারা সংশ্লিষ্ট জেলার বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনে সময় ক্ষেপণ করছেন। তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও ১৯টির মধ্যে ১২টিরই মেয়াদ পার হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নীলফামারী, হবিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, বগুড়া, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, সৈয়দপুর, পাবনা, নাটোর ও রাজশাহী। রাজশাহীর আহ্বায়ক কমিটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি কেন্দ্রে অভিযোগ করেছেন সেখানকার নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীরা বলেছেন, সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফাকে কোণঠাসা করতেই তার অনুসারী সক্রিয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে কমিটি করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে জেলার সাবেক সভাপতি নাদিম মোস্তফা আমাদের সময়কে বলেন, রাজশাহীর পুঠিয়া-দুর্গাপুরের সাজানো-গোছানো বিএনপি শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো দলের হাইকমান্ডের দেখা উচিত।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, পাবনায়ও একই অবস্থা। সেখানে খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের অনুসারীদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমান সবার মতামত নিয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত দিলেও তা মানা হচ্ছে না। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে এসব অভিযোগ জানানো হয়েছে। অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দলের নতুন আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ পার করেছে। তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করতে ২০ বছর পর চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি কৃষক দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মৎস্যজীবী দল ও ৬ এপ্রিল তাঁতি দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খতিয়ে দেখতে একাধিক টিম গঠন করেছেন।
সূত্র: deshebideshe.com – ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.