হুমায়ুন কবির জুশান; উখিয়া :
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্যাতন সবচেয়ে নৃসংশ হত্যাযজ্ঞ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অব্যাহত নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ১১ লাখের চেয়ে বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শহর মংডু, রাশিডং, বুচিডং, নাপপুরা, তুমব্রু বলিবাজারসহ গ্রামের পর গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গেল বছর ২৫ আগস্ট থেকে সেখানে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়েছে তাতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তচিৎকার করেছে। তাদের কান্না পুরো পৃথিবী ছড়িয়েছে।
মিয়ানমারের বর্বর সরকার হত্যা করেছে অসংখ্য নিস্পাপ শিশু, যুবক ও বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করেছে অসংখ্য মা-বোনদের, বিধবা করেছে হাজারো নারীদের, সন্তানহারা করেছে অসংখ্য মাকে, স্বামী হারা করেছে অসংখ্য স্ত্রীকে, ভাই হারা করেছে অসংখ্য বোনকে। এসব মজলুম মুসলমানেরা গত বছর মাহে রমজানে তাদের মাতৃভূমিতে রোজা পালন ও ঈদ করেছে। তাদের অনেকের অট্রালিকা বাড়ি-গাড়ি ও ধন সম্পদ ছিল। আজ তারা নিঃস্ব, অসহায়। স্বজনহারা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ইফতার করতে বসে মহান আলাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে ফরিয়াদ করতে দেখা গেছে। বিধবা রোহিঙ্গা নারী নুর কায়দা, নুর আয়েশা ও নুরে জান্নাত আঁচল দিয়ে দু,চোখের পানি মুছে বলছে, আমাদেরও স্বামী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল। আমরা আজ অসহায়। আমাদের স্বামীদের বর্মা মগ সেনারা নৃসংশভাবে হত্যা করেছে। ইফতারের সময়ে আলাহ দোয়া কবুল করে থাকেন। আমরা আল্লাহর কাছে এই হত্যার বিচার চাই। কী দিয়ে ইফতার করা হচ্ছে জানতে চাইলে, চনা, মুড়ি ও ডাল-ভাত দিয়ে ইফতার হচ্ছে বলে জানালেন কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি (নেতা) মোরশেদ আলম। এখনো পর্যাপ্ত ইফতার সামগ্রী তাদের কাছে নেই। তাই দোকান থেকে কিনে এনে অল্প চনা, মুড়ি খেয়ে ভাত খেয়ে ফেলব। এমনিতেই রোহিঙ্গারা মাগরিবের নামাজের পর থেকে এশারের নামাজের আগেই রাতের খাবার খেয়ে ফেলেন। তাদের মুখে অশ্রুজল। নারীদের ইজ্জত লুন্ঠিত হওয়ার কারণে মিয়ানমার থেকে এদেশে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি প্রবেশ করেছে।
মিয়ানমার ফকিরা বাজার থেকে দুই শিশু নিয়ে আসা হাজেরা খাতুন বলেন, সে কোন রকম কষ্ট করে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ৩০ কিলোমিটার পায়ে হেটে বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তিতে ঢুকে পড়েছেন। জানতে চাওয়া হলে হাজেরা খাতুন বলেন, তার স্বামী দিল মোহাম্মদকে মিয়ানমার সেনা বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। আর সেনা বাহিনীরা মহিলাদের ইজ্জত লুন্ঠন করেছে। এই ভয়ে সে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার বুচিদং থেকে আসা আরেফা বেগম জানান, চোখের সামনে তার স্বামী সাদ্দাম হোসেনকে ছুরিকাঘাতে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। রাশিডং থেকে পালিয়ে আসা সৈয়দা খাতুন জানান, মিয়ানমার সেনা বাহিনীর তান্ডবের শিকার হয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। সে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। এখানকার বাংলাদেশের মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ভয়াবহ সহিংসতার পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এ দেশে প্রবেশ করে। তারা কক্সবাজার জেলায় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি, বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তি, বালুখালী ঢালা রোহিঙ্গা বস্তি, তাজুনিমার খোলা রোহিঙ্গা বস্তি ও হাকিম পাড়া রোহিঙ্গা বস্তিতেসহ ১২টি শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এনজিওদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের স্থানীয় গ্রামবাসিরা শুকনো খাবার, চনা, মুড়ি, পানীয় জল এবং ইফতার সামগ্রী দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গা বস্তিগুলোতে বিনা বাধায় বিভিন্ন এনজিও সংস্থার পাশাপাশি গ্রামবাসিরাও ইফতার সামগ্রী নিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। ডাব্লিউ এফ পি সমস্ত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।
এ পর্যন্ত খাদ্যের অভাবে কোনো রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়নি। তাদেরকে সরকারি বেসরকারি এনজিও সংস্থার পাশাপাশি গ্রামবাসিরাও মানবিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বালুখালীর রোহিঙ্গা বস্তিসহ একাধিক রোহিঙ্গা মাঝি বলেন, মিয়ানমার সরকার মানুষের উপর চালিয়েছে পৈশাষিক নির্যাতন। রাখাইন প্রদেশে মুসলমান নিধন করার লক্ষে মিয়ানমার মগ সেনারা এই নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে বলে তারা দাবি করেন। উখিয়া উপজেলার ছাত্র দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্রোর পরিবারের পক্ষ থেকে ১ম রমজানের ইফতার সামগ্রী নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.