
বিদায়ীবছর জুড়ে টেলিকম খাতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে সিমের নিবন্ধনের বিষয়টি।
প্রাথমিক পর্যায়ে অবৈধ লেনদেন এবং অপরাধীদের সনাক্ত করার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতি আরোপের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এছাড়া ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধি, গ্রাহক-সন্তুষ্টিতে কলড্রপ সুবিধা, বিটিআরসির গণশুনানি, আইটিইও টেলিকম অ্যাওয়ার্ড অর্জন, সিটিসেল বন্ধ ও চালুসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে এই খাতে।
বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন : বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা ও দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম চলেছে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি নিয়ে। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর আঙ্গুলের ছাপ পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অপারেটরগুলো প্রস্তুতি নিতে আরও কিছুটা সময় নেয় এবং জানুয়ারি থেকে পুরোদমে শুরু হয় এ কার্যক্রম। বিষয়টি আদালতেও গড়ায়। গ্রাহকদের পরিচয় নিশ্চিত করে অপরাধ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে তথ্য ও আঙ্গুলের ছাপ মিলিয়ে চালু করা নিবন্ধনের এ প্রক্রিয়ায় এক দফা সময় বাড়িয়ে পুরনো সিম নিবন্ধনের কার্যক্রম শেষ হয় ৩১ মে।
টেলিকম খাতের বড় ধরনের ধাক্কা : নির্ধারিত সময়ে নতুন-পুরাতন মিলিয়ে ১১ কোটি ৬৩ লাখ সিম নিবন্ধন করে ছয়টি মোবাইল ফোন অপারেটর। এতে বড় রকমের ধাক্কা খায় গোটা টেলিকম খাত। নিবন্ধন শুরুর সময় অপারেটরগুলোর কার্যকর সিমের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৩৭ লাখ। এ পদ্ধতি চালুর ফলে তা প্রায় দুই কোটি কমে যায়। বছরের বাকি সময়েও তা পুষিয়ে নিতে পারেনি অপারেটরগুলো। বছরের এক মাস বাকি থাকতে কার্যকর সিমের সংখ্যা পৌঁছেছে ১১ কোটি ৯১ লাখে।
এক কোটি থ্রিজি গ্রাহক বৃদ্ধি : গত এক বছরে এক কোটি আট লাখ থ্রিজি সংযোগ পেয়েছে দেশের পাঁচটি মোবাইল ফোন অপারেটর। আগের অর্থবছর শেষে সব অপারেটরের থ্রিজি সংযোগ ছিল এক কোটি ৮০ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৮৮ লাখে।
পর্নোসাইট বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত : বিদায়ী বছরের আরেকটি আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল পর্নোসাইট বন্ধের সিদ্ধান্ত। ১৮ এপ্রিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সাত দিনের মধ্যেই সকল পর্নোসাইট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত পর্নোসাইট বন্ধ না হওয়ায় নতুন করে তারানা হালিম বলেন, ‘আমরা দেশের ভিতরের পর্নোসাইট বন্ধের উদ্দেশ্যে কমিটি করেছি। তারা দেশের ভেতরের পর্নোসাইটগুলোর তালিকা দেবে (কোন ব্যক্তির নয়)।’
পর্নোসাইট ভিজিটকারী ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা হবে- এমন সংবাদ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টিকে ভিত্তিহীন প্রচারনা বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধি : টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসি এখন পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, এ সময় পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা ছয় কোটি ৬৮ লাখ ৬২ হাজার। ২০১৫ সালের এ সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার। ২০১৫ সালের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এ সময়ে দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে এক কোটি ২৭ লাখ ৪২ হাজার। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে নতুন ইন্টারনেট সংযোগ বেড়েছে এক কোটি চার লাখ ১৬ হাজার।
গ্রাহক-সন্তুষ্টিতে কলড্রপ সুবিধা : গ্রাহক-সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে চলতি বছরের মে মাসে প্রতি কলড্রপের বিপরীতে গ্রাহককে কল মিনিট ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। বিটিআরসি থেকে প্রেরিত চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে একটি অপারেটর ছাড়া অন্যান্য অপারেটর গ্রাহকের প্রাপ্য কল মিনিট ফেরত দিচ্ছে না। অপারেটরগুলো বিষয়টি না মানায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে কলড্রপের বিপরীতে গ্রাহককে কল মিনিট ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কঠোর হচ্ছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।
জিপির বিনিয়োগ বেড়েছে, রবি, বাংলালিংক ও এয়ারটেলের কমেছে : বিদায়ী বছরে বড় টেলিফোন অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোনের বিনিয়োগ বেড়েছে ২১ শতাংশ। অন্যদিকে অন্য এই সারির অপারেটর রবি, বাংলালিংক এবং এয়ারটেলের বিনিয়োগ কমেছে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রবির বিনিয়োগ কমেছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। বাংলালিংকের কমেছে ২০ শতাংশ। আর এয়ারটেলের কমেছে ৩২ দশমিক ৯১ শতাংশ।
হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো বন্ধের বিষয়: দেশে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো বন্ধ করে দেওয়া হবে- এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর গত ২৯ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেগুলো কোনোভাবেই বন্ধ করা হবে না বলে জানান।
বিটিআরসির প্রথম গণশুনানি : গত ২২ নভেম্বর প্রথমবারের মতো গ্রাহকদের অভিযোগ শুনতে গণশুনানির আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সংস্থার করা প্রথম এমন আয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটকের প্রতিনিধি ছাড়া আর কোনো অপারেটরের প্রতিনিধি অংশ নেয়নি। তাই সরাসরি গ্রাহকরাও তাদের অভিযোগ সেসব অপারেটরদের প্রতিনিধিদের কাছে করতে পারেননি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তারা।
আইটিইও টেলিকম অ্যাওয়ার্ড : নভেম্বর মাসে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) টেলিকম ওয়ার্ল্ড-২০১৬ মেলায় ইনোভেটিভ আইসিটি সলিউশন উপস্থাপন, প্রচার-প্রচারণা এবং সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট তৈরির কৃতিত্বে আইটিইউ টেলিকম ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প।
রবি-এয়ারটেল মার্জার : ১৬ নভেম্বর থেকে একীভূত কোম্পানি হিসেবে রবি-এয়ারটেল তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর ম্যধ দিয়ে দেশে থাকবে না আলাদা করে এয়ারটেলের কোনো কার্যক্রম, নামডাক। দুটি কোম্পানি মিলে এখন অপারেটেরের নাম হলো রবি। একীভূত হয়ে রবি এবং এয়ারটেল কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড নামেই পরিচালিত হবে। একইসঙ্গে আজিয়াটার আরেকটি স্বাধীন ব্র্যান্ড হিসেবে থাকছে এয়ারটেল।
সব সাইবার ক্যাফে সিসিটিভির আওতায় : দেশে সাইবার হামলা রোধে সতর্কতা হিসেবে গত ৯ নভেম্বর সাইবার ক্যাফেগুলোকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে আনার লক্ষ্যে সবগুলো সাইবার ক্যাফেকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ সংস্থা বা বিটিআরসি।
সিটিসেল বন্ধ ও চালু : দেশের প্রথম মোবাইল ফোন অপারেটর সিটিসেলের কাছ থেকে মোট ৪৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে- এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০ অক্টোবর বিটিআরসি সিটিসেলের স্পেকট্রাম বরাদ্দ স্থগিত করে দেয়। পরে এ ব্যাপারে সিটিসেল সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। ১৯ নভেম্বরের মধ্যে বিটিআরসিকে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের ভিত্তিতে স্পেকট্রাম খুলে দেয়ার আদেশ দেন আপিল বিভাগ । সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এনবিআর ও বিটিআরসিকে ১৪৪ কোটি টাকা পরিশোধ করে সিটিসেল। ফলে বন্ধ হওয়ার ১৭ দিনের মাথায় ৬ নভেম্বর পুনরায় কার্যক্রম চালু করে অপারেটরটি।
ফ্রি হেল্প ডেস্ক : বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো নাগরিকদের জরুরী প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে জাতীয় ন্যাশনাল হেল্প ডেস্ক (৯৯৯) সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে সরকার। ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে নাগরিকরা এ ডেস্ক থেকে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে পারবেন। এ জন্য গ্রাহকের কোনো রকম খরচ লাগবে না।
ডটবাংলা ডোমেইন : গত অক্টোবর মাসে ডটবাংলা (.বাংলা) ডোমেইন চূড়ান্ত বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ডট বাংলা আইডিএনের যাত্রা শুরু হল। ইন্টারনেট কর্পোরেশন অব অ্যাসাইন্ড নেমস অ্যান্ড নাম্বার (আইসিএএনএন) বোর্ড সভায় ডটবাংলা বাংলাদেশকে বরাদ্দ দেয়।
এমএনপি নিলামে পাঁচ কোম্পানি : মোবাইল ফোন নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর বদল বা এমএনপি সেবার লাইসেন্সের নিলামের জন্য পাঁচ কোম্পানির নাম চূড়ান্ত করেছে বিটিআরসি। এগুলোর মধ্যে থেকে এ সেবা দেওয়ার জন্য নিলামে নির্বাচিত হবে একটি কোম্পানি। এ সেবা দেওয়ার জন্য বাছাই করা কোম্পানিগুলো হলো- রিভ নাম্বার লিমিটেড, গ্রিনটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ইনফোজিলিয়ন, টেলিটেক কনসোরটিয়াম, ব্রাজিল-বাংলাদেশ কনসোরটিয়াম ও রুটস ইনফোটেক। কিন্তু গত ২৮ সেপ্টেম্বর এমএনপি নিলামের কথা থাকলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য তা বন্ধ রয়েছে।
গ্রামীণের নতুন সিরিজ : গ্রামীণফোনের বিদ্যমান নম্বর সিরিজ ‘০১৭’ ফুরিয়ে আসায় তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অপারেটরটিকে ‘০১৩’ সিরিজের নতুন কোড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি।
সূত্র:আবু বকর ইয়ামিন/risingbd.com,ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.