
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর প্রায় আড়াই মাস পর প্রথমবারের মতো রাজ্যটি সফরে গেছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর ও শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সুচি। অঘোষিত এই সফরের বিষয়টি বিশ্ব গণমাধ্যমে জানাজানি হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রাখাইন সফরে গিয়ে কি দেখলেন এবং কি করলেন সুচি?
সুচির সঙ্গে রাখাইন পরিদর্শনে যাওয়া আরাকান প্রজেক্ট মনিটরিং গ্রুপের নেতা ক্রিস লেওয়া জানান, রাখাইনের রাজধানী সিত্তোয়ে থেকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে মংডুসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন সুচি। এ ছাড়া রাখাইনের প্রত্যন্ত অঞ্চল পরিদর্শনে গিয়ে সুচি যাত্রাপথে রাস্তার পাশে কিছু মানুষের জটলা দেখে গাড়ি থামান এবং সবার সঙ্গে কথা বলেন।
ক্রিস লিওয়া বলেন, ‘এই সময় মিয়ানমারের সেস্ট কাউন্সিলর সুচি লোকজনকে শুধু তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় বলেন, তারা রাখাইনে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন, সরকার আছেই তাদের সাহায্য করার জন্য এবং তারা যেন নিজেদের মধ্যে ঝাগড়া না করেন।’
সুচি এমনই একসময়ে রাখাইন পরিদর্শনে গেলেন যার কয়েক ঘণ্টা আগেও রোহিঙ্গাদের বড় একটি দল বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বার্তা সংস্থার রয়টার্সের একজন আলোকচিত্রী জানান, কয়েক ঘণ্টা আগেই দুর্গম, কর্দমাক্ত পথ ধরে রাতের আঁধারে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে দেখেছেন তিনি। এসব রোহিঙ্গা ঘরে তৈরি বাঁশের দোলনায় করে শিশুদের নিয়ে হাঁটছিলেন। খুব বয়স্ক মানুষ চেপে বসেছিল অন্যের পিঠে। তাদের হাতে-কাঁধে ব্যাগ-বোঁচকাও ছিল।

এর আগে ২ নভেম্বর সকালে অং সান সুচির মুখপাত্র জ হতয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সুচি এখন রাখাইনে রয়েছেন। তিনি মংডু ও বুথিডংয়েও যাবেন। এটা একদিনের সফর’। তবে হঠাৎ তিনি কেন রাখাইনে গেলেন সে সম্পর্কে কিছু জানাননি ওই মুখপাত্র। এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একজন প্রতিনিধি সুচি’কে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে রাখাইনের রাজধানী সিত্তোয়ে হেলিকপ্টার থেকে নামতে দেখেন।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট শুরু পর রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে একটি যৌক্তিক সমাধানের চেষ্টা করছে শরণার্থীর ভারে নূজ্য বাংলাদেশ। এরই মধ্যে সুচির একজন মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশের জন্যই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজে দেরি হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আর্ন্তজাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার পাওয়ার আশায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দেরি করছে বাংলাদেশ।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি। রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার এ ধারা অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পালিয়ে আসার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও, ১৫ অক্টোবর থেকে তা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে কিছু এরিয়াল ফুটেজ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআইচসিআর। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, উখিয়ার পালংখালির কাছে নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় জাতিসংঘ মনে করছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনে নেমেছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯০ ভাগই হলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর মধ্যে ১১শ’র বেশি রোহিঙ্গা শিশু পরিবার ছাড়া অচেনাদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আর এসব শিশুর চোখের সামনেই তাদের বাবা-মাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা, মা-বোনদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে। অ্যামনেস্টি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’
অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৮টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম। সংস্থাটি আরও জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।
সূত্র:আবু আজাদ-.priyo.com;ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.