
ডেনমার্কের নারী ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেওয়া নাদিয়া নাদিম। ছবি: সংগৃহীত
উয়েফা নারী ইউরো কাপ ২০১৭। কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নেমেছে ডেনমার্ক ও জার্মানি। ফুটবলীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যে জার্মানির চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে ডেনমার্ক। নারী ফুটবলে যাদের অর্জনের খাতায় সাফল্য নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ইউরো কাপের শেষ ছয়বারের শিরোপা জিতেছে জার্মানি। এই ম্যাচের আগে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে রাখা হয় জার্মানদের। ম্যাচের শুরুতে গোল করে এর প্রমাণ রাখেন জার্মান নারীরা। ডেনমার্কের পরাজয় মনে হচ্ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। ঠিক তখন বাঁধ সাধলেন ডেনমার্কের স্ট্রাইকার নাদিয়া নাদিম। তার গোলে সমতায় ফেরে ড্যানিশরা।
নাদিয়া নাদিম ডেনমার্কের নাম্বার নাইন। নাদিমের গোলের পর নতুন করে প্রাণ ফেরে ডেনমার্ক শিবিরে। দ্বিতীয়ার্ধে আরও এক গোল করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ডেনমার্ক। ডেনমার্কের ফিরে আসার গল্পটা লেখা হল যার হাত ধরে সেই নাদিয়া নাদিম আর দশটা ড্যানিশ মেয়ের মতো সোনালী চুলের অধিকারী নন। তিনি বাকি সবার চেয়ে বেশ আলাদা! এই নাদিয়া নাদিমের জীবনের শুরুটাও আর দশটা ড্যানিশ মেয়ের মতো নয়। চলুন ঘুরে আসি জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক নাদিয়া নাদিমের অতীত থেকে।
সেনা কর্মকর্তা রাবানি ও হামিদা দম্পতির পাঁচ মেয়ের একজন নাদিয়া। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তানের হেরাতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাকি চার বোনের চেয়ে আলাদা ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। তার বয়সী মেয়েরা যখন পুতুল খেলায় ব্যস্ত, তখন তার ধ্যানজ্ঞান ফুটবলের জগতে। বাবার সঙ্গে তার সময় কাটতো বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় ফুটবল খেলে। বাবার কাছ থেকেই ফুটবলে হাতেখড়ি নাদিয়ার।
এভাবেই চলছিল বেশ। কিন্তু নাদিয়া দশ বছরে পা দিতেই বদলে যায় তার জীবন। ওলট-পালট হয়ে যায় সকল হিসাব-নিকাশ। তখনও তালেবানদের শাসনামল চলছে আফগানিস্তানে। হুট করে একদিন এক জরুরী বৈঠকে ডাকা হয় নাদিয়ার বাবা রাবানিকে। সেই বৈঠকই কালো একটা রেখা টেনে দিলো নাদিয়ার পরিবারে। সেই বৈঠকে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি রাবানি। এই ঘটনার পর বহু খোঁজ নিয়ে হামিদা জানতে পারেন মরুভূমিতে নিয়ে তার স্বামীকে হত্যা করেছে তালেবানরা।
হামিদা ও তার পাঁচ মেয়ের সম্বল কেবল থাকার ঘরটা। তালেবানদের অধীনে নারীদের কাজ করারও অনুমতি নেই। এছাড়াও বুলেট-বোমার আতঙ্ক তো ছিলই! এই বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পেতে পরিবারের সকল সঞ্চয় এক করে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন হামিদা। সঙ্গী তার পাঁচ মেয়ে। হামিদার এই এক সিদ্ধান্তেই বিশাল মোড় নেয় নাদিয়াদের জীবন।

ডেনমার্কের জার্সি গায়ে নাদিয়া নাদিম।
অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানরা। অর্থের বিনিময়ে নকল পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়েন হামিদা। ইতালির বিমানবন্দর থেকে তাদের তুলে দেওয়া হয় এক ট্রাকে। তারা তখনও জানতেন লন্ডনে যাচ্ছেন তারা। কয়েকদিন ভ্রমণের পর থামে সেই ট্রাক। ট্রাক থেকে নেমে তাদের অবাক হওয়ার মতো অবস্থা। লন্ডন নয়, তারা পৌঁছেছেন ডেনমার্কের শহরতলীর এক গ্রামে।
নাদিয়াদের নতুন ঠিকানা ডেনমার্কের শরণার্থী শিবির। সেখানেই শুরু হয় কিশোরী নাদিয়ার ফুটবল অনুশীলন। সৌভাগ্যবশত ফুটবল খেলার সঙ্গী পেয়ে যান নাদিয়া। তার মতো আরও অনেক মেয়েও যে ফুটবল খেলে ডেনমার্কে। এই দৃশ্যে এর আগে কল্পনায়ও আসেনি নাদিয়ার।
এর কিছুদিন পর পাশের শহরের এক ক্লাবের হয়ে অনুশীলন শুরু করেন তিনি। মা হামিদাও কাজ পেয়েছেন। সুদিন ফিরল বলে! শরণার্থী শিবির ছেড়ে নাদিয়া পড়লেন নতুন সমস্যায়। নতুন বাসা থেকে ক্লাবের দূরত্ব বেশি। তার এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যায় সেই ক্লাবই। ক্লাব কর্তৃপক্ষ বাস পাসের ব্যবস্থা করে দেয় নাদিয়াকে।
পেশাদার কোচের অধীনে অল্পদিনেই ফুটবল মাঠে ঝড় তুললেন নাদিয়া। ধাপে ধাপে বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে জায়গা করে নিলেন সিনিয়র দলে। এরপর কেবল একটার পর একটা স্বপ্নের সিড়ি অতিক্রম করা। সিনিয়র দলে দারুণ পারফর্ম করে ডেনমার্ক নারী জাতীয় ফুটবল দলের কোচের নজর কাড়লেন খুব দ্রুত। ডাক মিলল বলে!

পোর্টল্যান্ড টিমবার্সের জার্সি গায়ে নাদিয়া নাদিম।
নাদিয়ার সামনে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় ডেনমার্কের আইন। নারী কিংবা পুরুষ জাতীয়তায় ড্যানিশ না হলে ডেনমার্কের ফুটবল দলে জায়গা নেই কারো। তবে নিয়ম বদলেছে তার বেলায়। জাতীয়তায় ড্যানিশ না হয়েও সুযোগ পেয়েছেন ডেনমার্কের নারী জাতীয় ফুটবল দলে। তাকে জাতীয়তা দেয় ডেনমার্ক। এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিল ফিফাও। তবে ডেনমার্ক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় আপত্তি তুলে নেয় বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা। নাদিয়া নাদিমই একমাত্র ফুটবলার যিনি ভিনদেশী হয়েও ড্যানিশ সিটিজেনশীপ নিয়ে ডেনমার্ক জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন।
বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া সেই নাদিয়া এখন খেলছেন নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে। দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে তার নাম। আফগানিস্তানের সেই ছোট্ট নাদিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রর সবচেয়ে বড় নারী ফুটবল ক্লাব পোর্টল্যান্ড টিমবার্সের হয়ে খেলেন। পোর্টল্যান্ডের গ্যালারিতে দর্শকরা নাদিয়া! নাদিয়া! রবে মাতিয়ে রাখেন স্টেডিয়াম। শুধুমাত্র ফুটবলেই সীমাবদ্ধ নেই নাদিয়া। ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেছেন মেডিকেল ডিগ্রী। সার্জারিতে তার প্রচুর আগ্রহ। তার কোন সতীর্থ অসুস্থ হলে নিজেই চিকিৎসা করেন।
ডেনমার্কের নাগরিক তিনি কাগজে কলমে। একদিন ভুল করেই গিয়েছিলেন সেখানে। তার ফুটবলীয় কারিশমাতেই ফুটে উঠে ডেনমার্কের প্রতিচ্ছবি। তিনিই ডেনমার্ক ফুটবলের পোস্টার গার্ল।
নাদিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সন্থা ইন্ডিপেনডেন্ট.ইউকের মূল্যায়ন, ‘নাদিয়া নাদিম ডেনমার্কের নারী ফুটবলার। তালেবান সৈন্যদের হাত থেকে পালিয়ে এসে ডেনমার্কে সঠিক ফুটবলের প্রবর্তন করেছে।’ এক প্রতিবেদনে ডেইলি মেইল লিখেছে, ‘নাদিয়া নাদিম; শরানার্থী শিবির থেকে ড্যানিশ ফুটবলের রোল মডেল।’
ইয়োর স্টোরির এক প্রতিবেদনের আলোকে, ‘আফগানিস্তান; যেখানে তালেবনরা রাজত্ব করে। সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে ডেনমার্কের হয়ে ফুটবল খেলা। নাদিয়া নাদিমের দুঃসাহসিক যাত্রা।’
সূত্র:জুবায়ের আহমেদ তানিন/priyo.com,ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.