
দীপক শর্মা দীপু; কক্সভিউ :
ইচ্ছা শক্তির কাছে অন্য সব শক্তি পরাজিত হয়। অভাব অনটন – কষ্ট বেদনা ইচ্ছা শক্তির কাছে হার মানে। কোন কিছুতেই দমিয়ে রাখা যায়না প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকা যে কোন ব্যক্তিকে। বিশেষ করে এটার প্রমাণ মেলে ছাত্র-ছাত্রীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে।
কক্সবাজারের ৩ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন থেকে জানা যায়, তাদের চলার পথে দমিয়ে রাখতে পারেনি কোন বাঁধা। এস এস সি পরীক্ষা ২০১৯ সালের ফলাফলে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত জাবেদুল ইসলাম ফাহাদ, শাহিন সুলতানা, মোহাম্মদ পারভেজ মোশারফের কথা বলছি। যাদের জিপিএ ৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাঁধা ছিল। সব বাঁধা উপড়িয়ে তারা এসএসসি’র ফলাফলে লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে। তাদের সবাই একটি কথা- ‘ইচ্ছা শক্তির কাছে কোন বাঁধা গতিরোধ করতে পারেনি।’
১৪ মে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত কক্সবাজার জেলা প্রশাসন আয়োজিত জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এই ৩ জন অদম্য শিক্ষার্থীদের জানা যায়।
উখিয়ার রত্নাপালং এর থিমছড়ির মোহাম্মদ পারভেজ মোশরাফ ৫ম শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার পর তার ইচ্ছা ছিল শহরের কোন ভালো স্কুলে পড়ালেখা করবে। কিন্ত বাবা রশিদুল ইসলামের পক্ষে শহরের কোন ভালো স্কুলে পড়ানোর মতো সামথ্য নেই। বাধ্য হয়ে গ্রামের একটি হাই স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে জেএসসিতে তার কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন হয়নি।
জেএসসি’তে জিপিএ ৫ না পাওয়ায় সে আবার বাবাকে এবং মা খতিজা বেগমকে শহরের ভালো স্কুলে পড়ানোর কথা বলেন। তখনও বাবা আর্থিক অসচ্ছলতার কথা বলে তার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা খেয়ে না খেয়ে হলেও সে কক্সবাজার শহরে কোন ভালো স্কুলে পড়বেই পড়বে। পরে গরীব বাবা বাধ্য হয়ে কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয় একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। কক্সবাজারে প্রথমে থাকার জায়গা না থাকায় স্কুলে নিয়মিত ক্লাস করতে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া গেলেও খাবারের খরচ দিতে হয়।
একসাথে তিন ভাইবোনকে পড়ালেখার খরচ টানতে গিয়ে দরিদ্র বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। এরপরও ছেলের ইচ্ছাকে সমর্থন গিয়ে বাবা পিছ পা হননি। স্কুলে নিয়মিত বেতন, পরীক্ষা ফি: দিতে পারেননি। কিন্তু স্কুল থেকেও তাকে তেমন চাপাচাপি করেনি। প্রাইভেট শিক্ষকের কাছেও পড়তে পারেনি। আরও কত সমস্যা ছিল। কিন্তু পারভেজ সমস্যার কথা কাউকে জানার সুযোগ দেয়নি। নিজের মত করে অভাব অনটনকে মেনে নিয়েছে। এসব নানা সমস্যা ও বাঁধা থাকলেও পারভেজ তা মোকাবেলা করে এগিয়ে গেছে। নিজ লক্ষ্য আর অটুট ইচ্ছা শক্তিতে সব বাঁধাকে পার করে ঠিকই জিপিএ ৫ অর্জন করেছে পারভেজ।
তার ইচ্ছা সে বুয়েটে পড়ালেখা করবে, হতে চায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তার মনে আবারও সংশয় সে যদি ভালো কলেজে পড়তে না পারে। ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও যদিও বাবা যদি না পারেন। এবার বাবাকে আর চাপ দেয়া যাবেনা। কারণ সে পরিবারে বড় ছেলে। তার পড়ালেখার খরচ চালাতে গিয়ে যদি তার ছোট দুই ভাই বোনের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়! এমন চিন্তায় মগ্ন এখন পারভেজ।
শাহিন সুলতানা মহেশখালীর ধলঘাটা সুতরিয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিইসি’তে জিপিএ ৫ পাওয়ার পর তার ইচ্ছা জাগে আগামিতে যত পরীক্ষা হবে সব পরীক্ষাতে জিপিএ ৫ পেতে হবে। কিন্তু ধলঘাটায় ভালো কোন মাধ্যমিক স্কুল নেই। মহেশখালীর গোরকঘাটাও অনেক দুর হয়ে যায় । মেয়ে ইচ্ছা পূরনের জন্য মেধা যাচাইয়ের ভাগ্যটা মেয়ের উপর ফেলা দেয়া হয়। শাহিন যদি কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় উর্ত্তীন হয় তাহলে তাকে পড়ানো হবে কক্সবাজারে গিয়ে। তা না হলে মহেশখালিতে পড়তে হবে। কিন্ত শাহিন সুলতানা কঠোর পরিশ্রম করে ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় উর্ত্তীণ হয়। কিন্ত হতদরিদ্র বাবা কামাল উদ্দিন এখন কি করবেন! ভর্তি পরীক্ষায় টিকলে মেয়েকে কথা দিয়েছে কক্সবাজারে পড়াবে। তাই পুরো পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে চলে আসেন। কিন্তু কক্সবাজারে কি কাজ করবেন তা ভেবে পাচ্ছেননা। অবশেষে একটি ছোট পানের দোকান খুলে বসেন। খরচ বাঁচাতে থাকেন শহর থেকে অনেক দুরে বিজিবি ক্যাম্প এলাকায়। শাহিনের ৭ ভাই বোন। তারাও সবাই পড়ালেখা করছে। তাদেরও খরচ চালাতে হয়। আর ৭ ভাই বোনকে পড়ালেখা করাতে মা নুরুজ জাহানকেও করতে হয় অক্লান্ত পরিশ্রম।
শাহিনের এখন ইচ্ছা শক্তি আরো বেড়ে গেছে। সে তার কথা রাখতে চায়। জেএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে। এতদিন অর্থের অভাবে প্রাইভেট না পড়ালেও মেয়েকে এবার এসএসসি’র প্রস্তুতির জন্য প্রাইভেট পড়াতে হবে। এমন মনে করে তার মা নুরুজ জাহান শিক্ষকদের অনুরোধ করে অনেকটা বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ করে দেন। নানা টানাপোড়ন জয় করেছে শাহিনের ইচ্ছা শক্তি। এসএসসিওতে পেয়েছে জিপিএ ৫। শাহিন চিকিৎসক হতে চায়। ভালো মানুষ হয়ে মানুষের চিকিৎসা সেবা করতে চায় শাহিন।
কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মসজিদের মুয়াজ্জিম আবদুল গফ্ফার এবং গৃহিনী উম্মে ছালমা এর ছেলে জাবেদুল ইসলাম ফাহাদ এবারের এসএসসি’তে জিপিএ ৫ পেয়েছে। মুয়াজ্জিম আবদুল গফ্ফারকে তার যশ সামান্য বেতন দিয়ে তার তিন সন্তানকে পড়ালেখা করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বড় ছেলে কক্সবাজার সরকারি কলেজে অনার্স (ইংলিশ) নিয়ে পড়ছে। ছোট ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। মেজ ছেলে ফাহাদকে পড়ালেখা করানোর মত সামর্থ্য তার ছিলনা।
স্কুলের শিক্ষকরা বিনা বেতনে প্রাইভেট ও কোচিং করার সুযোগ দিয়েছেন। বই খাতাসহ শিক্ষা সামগ্রীও শিক্ষকরা দিয়েছেন। এত দৈন্যতা দেখেছে ফাহাদ। কিন্ত পিছু হটেনি পড়ালেখা থেকে। তার অদম্য ইচ্ছায় সে এগিয়ে গেছে। জেএসসি ও এসএসসি’তে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। ফাহাদ ভালো মানুষ ও ভালো চিকিৎসক হতে চায়। কিন্তু তার সংশয় হচ্ছে, তার বাবা স্কুলের মুয়াজ্জিম বলে শিক্ষকসহ সবাই সহযোগিতা করেছেন। এখন কলেজে সেই সুযোগ সুবিধা না পেলে বাবার দ্বারা সম্ভব তার পড়ালেখার খরচ চালানো আদৌ সম্ভব হবে কিনা!
যাই হোক অদম্যদের আগামিতে যতই বাঁধা আসুক কেন এসএসসি’র মতো তারা সামনে এগিয়ে যাবে, আবারো জয় করবে।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.