পাহাড় ঘেষা গ্রামে পানি কমলেও তলিয়ে রয়েছে উপকূল সড়ক-বাঁধে শত শত মানুষের আশ্রয়

মুকুল কান্তি দাশ; চকরিয়া :
বৃষ্টি থামায় উজান থেকে পানি নামছেনা মাতামুহুরী নদী দিয়ে। ফলে নদী তীরবর্তী কক্সবাজারের চকরিয়ার ১১টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ বসতি এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। ভেসে উঠেছে ক্ষত চিহ্ন। জলাবদ্ধতার কারণে ৬টি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে।
অন্যদিকে, উপকূলের ৭টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে আছে। এসব প্লাবিত এলাকার অন্তত দুই লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। খাদ্য ও পানীয়জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারী-বেসরকারীভাবে বিতরণ করা ত্রাণ অপর্যাপ্ত হওয়ায় ঘরে ঘরে হাহাকার চলছে। উপকূলের শত শত মানুষ পাঁচদিন ধরে তাবু টাঙ্গিয়ে আঞ্চলিক মহাসড়ক ও বিভিন্ন বেঁড়িবাধের উপর আশ্রয় নিয়ে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে।
সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মাতামুহুরীর নদীতে পানি কমায় নদী তীরবর্তী বেশির ভাগ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও ভিটেতে অধিক পলি পড়ায় ফলজ গাছ মারা যাচ্ছে। ওইসব এলাকায় পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে। ভেসে উঠা টিউবওয়েলগুলোতে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট না দেয়ায় পানি পান করা যাচ্ছেনা। এসব এলাকায় পানি নেমে গেলেও ছড়াখাল খনন না হওয়ায় ভয়াবহ জলাবদ্ধার সৃষ্টির কারণে কাকারার ১নং ওয়ার্ডের দুটি পাড়া, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিলে ১টি করে ও বরইতলীতে দুটি পাড়ার মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। নদী তীরবর্তী ১১টি ইউনিয়নের পানি কমার সাথে সাথে ভেসে উঠা কাঁচা-পাকা সড়কে ক্ষত চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম সিদ্দিকী সড়কের বেশিরভাগ অংশই ভেঙ্গে গেছে।
অপরদিকে, উপকূলীয় এলাকার পশ্চিম বড় ভেওলা, কোণাখালী, ঢেমুশিয়ার পুরো ইউনিয়ন ও পূর্ব বড় ভেওলা, সাহারবিল, বিএমচর, বদরখালীর একাংশ পানির নিচে তলিয়ে আছে। এসব এলাকায় জন দুর্ভোগ চরমে পৌচেছে। সড়কে-বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে।
এদিকে, ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী মানুষ খাদ্য ও পানীয়জলের সংকটে ভুগছে। সরকারী-বেসরকারীভাবে তাদেরকে দেয়া ত্রাণ পর্যাপ্ত নয়। কেউ ত্রাণ নিয়ে এলাকায় গেলেই শত শত নারী-পুরুষ জড়ো হচ্ছে খাবার পাবার আশায়। তবে, কেউই সবার চাহিদা মেটাতে পারছেনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারীভাবে বরাদ্দ দেয়া মাত্র ১ লাখ টাকা কোন ইউনিয়নকে ৫ হাজার ও কোন কোন ইউনিয়নকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা শুকনো খাবার বিতরণ করে। বেসরকারীভাবে কয়েকজন রাজনীতিবীদ ও সমাজসেবক খিচুড়ি বিতরণ করেন। বৃহস্পতিবার থেকে দুর্গত এলাকায় খাদ্য বিতরণ করেন স্বাধীন মঞ্চ, পীচ ফাইন্ডারসহ বেসরকারী কয়েকটি সংগঠন। শুক্রবার দুর্গত মানুষের পাশে দাড়ায় চকরিয়া প্রেসক্লাব। ক্লাবের পক্ষ থেকে ২’শতাধিক বন্যা দুর্গত পরিবারকে দেয়া হয় চাউল, পিয়াজ, ডাল, খাবার স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় পণ্য।
সরজমিন উপকূলীয় এলাকা পরিদর্শনকালে কথায় হয় দুর্গত মানুষের সাথে। তাদের মধ্যে মো.আব্দুল গণি (৬০)। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের (ভেওলা মানিকচর) খঞ্জনাঘোনা এলাকার মৃত আলী হোসেনের ছেলে। সংসার জীবনে চার ছেলে ও চার মেয়ের জনক। তিন ছেলে বিয়ে করে ছেড়ে গেছে তাদের। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রী, ছোট ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার তার।
দিনমজুরি করে কোনমতে টেনে নিচ্ছিলেন সংসারের ঘানি। টাকার অভাবে মেয়েদের বিয়ে দিতে পারছেন না। বিয়ের টাকা জোগাড় করতে গত তিনবছর ধরে ফসল জমিয়ে আসছিলেন তিনি।
কিন্তু মাতামুহুরি নদীর ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বড় একটি ধাক্কা খেলেন তিনি। বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে তার এতদিনের জমানো সব ফসল (ধান)। ঘরবাড়ি পানিতে ভেসে গেছে। পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তায়। পলিথিনের তৈরি ছাউনীতে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। শুধু গণি নন, তার মতো পাশ্ববর্তী রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন চকরিয়ার উপকূলীয় ইউনিয়নের শত শত পরিবার।
ক্ষোভ প্রকাশ করে আব্দুল গণি আরো বলেন, ‘পাঁচদিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে বসতবাড়ি ডুবে গেলে আঞ্চলিক মহাসড়কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। পুরো পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে থাকলেও কেউ আমাদের খবর নেয়নি। শুক্রবার পর্যন্ত নামমাত্র খাবার পেলেও তা পরিবারের সদস্যদের একদিনেই শেষ হয়ে যায়। শুধুমাত্র ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাঙ্গীর সামান্য চিড়া আর এক টুকরো গুড় দিয়ে গেছেন। কিন্তু এরপর চারদিন পার হয়ে গেলেও কেউ আর আমাদের খোঁজ নেয়নি। খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।
উপজেলার কোণাখালীর বাসিন্দা রাজিয়া বেগম বন্যার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে মূল্যবান জিনিসপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কোণাখালী ইউনিয়নের বেঁড়িবাধের উপর। কিন্তু সেখানেও তারা নিরাপদ নয়। উঠতি বয়সি মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন সড়কে আশ্রয় নেওয়া এসব অভিভাবকরা।
বিএম চর ইউপির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়। তারপরও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্যার্ত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। তাদের জন্য খিচুড়ি রান্না করে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে নগদ এক লাখ টাকা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যা দুর্গতদের মাঝে ১ হাজার প্যাকেট ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি আবারো নগদ অর্থ দেওয়া হবে। এছাড়া সড়কের উপর যারা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের খাবার দেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.