
হাসান মাহামুদ : পৃথিবীতে খুব কম জাতিসত্তা কিংবা জাতীয়তা গড়ে ওঠেছে ভাষার ভিত্তিতে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য। আমরা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের একটি জাতি। আমাদের জাতীয়তার উৎপত্তি ভাষা থেকে। আমরা যে ভৌগোলিক সীমারেখা অর্জন করতে পেরেছি সেখানেও বড় অবদান ভাষার।
বিশ্বে একমাত্র বাংলা ভাষার দুটি অনন্য আর্ন্তজাতিক বিজয় এবং স্বীকৃতি রয়েছে। একটি জাতিগোষ্ঠী ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়ে মুখের ভাষা আদায় করেছে এবং সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয় বাংলাভাষাকে ঘিরে। আজ থেকে ১৭ বছর আগে ১৯৯৯ সালের এই দিনে (১৭ নভেম্বর) ইউনেস্কো আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আমাদের জাতিসত্তার কথা বলছিলাম। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক মতবাদ। কমিউনিজম বা মানবতাবাদের মতো এতটা প্রসারিত না হলেও ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের নামে মানুষ যেভাবে একত্রিত হয় তার থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের গণ্ডি অনেক প্রসারিত। ভাষা যতখানি বাস্তবতা ধর্ম-বর্ণ বা গোত্র অতখানি বাস্তবতা নয়। ভাষা মানুষের জীবনযাপনের যতটা গভীরে, ধর্ম-বর্ণ বা গোত্র সেটা নয়।
বিষয়টির সর্বশেষ নজির হিসেবে উল্লেখ করা যায় বেলজিয়ামের সর্বশেষ নির্বাচনের প্রসঙ্গটি। ‘ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র’ নিয়েই বেলজিয়ামে চলছিলো বিবাদ। সেই সূত্র ধরেই নির্বাচন। নির্বাচনে জয়ী হয় ওলন্দাজ ভাষীদের দল ‘দ্য নিউ ফ্লেমিশ এলায়েন্স পার্টি’, যারা চাচ্ছিল পৃথক ওলন্দাজ ভাষী রাষ্ট্র৷ এমনকি বিজয়ের পর বার্ট ডে ওয়েফা বলেছিলেন, ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাঁর কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে বেলজিয়ামে কোনো একক জাতীয় রাজনৈতিক দল নেই, দুই ভাষাভাষীদের সমর্থনে রয়েছে ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক দল।
বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। এ সূত্রে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিকদের। বস্তুত, তাঁদের অবদান ও আত্মত্যাগের ফলেই যেমন রক্ষা পেয়েছে বাংলা ভাষার মর্যাদা, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিসংগ্রামের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি।
মানুষের ভাষা ব্যবহারের সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবে বাংলা ভাষার অবস্থান সপ্তম। আমাদের মাতৃভাষার জন্য এ এক বিশাল গৌরব। পৃথিবীতে চার সহস্রাধিক ভাষার মধ্যে সপ্তম স্থানে থাকা বাংলা ভাষা প্রকৃত অর্থেই দাবি করতে পারে গৌরবের আসন। প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ সংখ্যাতত্ত্বও আমাদের মাতৃভাষায় গৌরবের অন্যতম ভিত্তি-উৎস।
বায়ান্নর শহীদদের স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে আমাদের ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর মানুষের উত্তরাধিকারে রূপান্তরিত হয়েছে। ১ মে যেমন আন্তর্জাতিক মে দিবস, যা পালিত হয় পৃথিবীর সব দেশে, ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি তেমনি পালিত হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বাঙালি জাতির জীবনে এমন গৌরবোজ্জ্বল অর্জন আর ঘটেনি। গোটা বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সব ইতিহাসই এখন উঠে আসছে বিশ্বের মানুষের সামনে।
কিন্তু এই স্বীকৃতি অর্জনের ইতিহাস অনেকেরই অজানা ছিল দীর্ঘদিন। এমনকি এই কঠিন কাজটি যারা করেছেন তাদের একুশে পদকে ভূষিত করা হয় এই বছর, ১৭ বছর পর। সেটা যদিও ভিন্ন প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে বরাবরই এমন হয়ে আসছে।
কিন্তু এই লেখার মূল উপজীব্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক সংস্থা- ‘ইউনেস্কো’। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, যে বাংলা ভাষার ঐতিহ্যময় আন্দোলনের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করা হয়েছে সেই ভাষাতেই ওয়েবসাইটটি পড়া যায় না। ৬টি ভাষায় জাতিসংঘের ওয়েবসাইটটি (www.un.org) পড়া যায়। ভাষাগুলো হচ্ছে- ইংরেজী, রাশিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্পেনিস, আরবি এবং চাইনিজ।
এমনকি তখন জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে যে ইভেন্টটি চালু করা হয়েছিল, তাও এখন আর পাওয়া যায় না। ইভেন্টটির লিংক হচ্ছে -(http://www.un.org/en/events/motherlanguageday/)। লিংকটিতে ক্লিক করলে ‘এরর’ দেখায়। অর্থ্যাৎ লিংকটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের দোষ কতটা সেই তর্কে যাওয়ার আগে আমাদের কর্তব্যটা সর্ম্পকে ভাবাচ্ছে আমাদের। আমরা জাতিগতভাবে এই ইভেন্টটিকে বিশ্বে তুলে ধরতে কি করেছি?
ক্যানাডার ভ্যাংকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা দিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সালে। তাদের কথাও তো আমরা বেমালুম ভুলে ছিলাম।
এখন সময় এসেছে জাতিসংঘের ওয়েবপেজে ‘বাংলা ভাষা’ সংযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয় যে ভাষার ঐতিহ্যময় আন্দোলনের দিনটিকে সম্মান দিয়ে, সেই ভাষা তাদের ওয়েবসাইটে সংযোজনের জন্য এবং জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে যোগ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়।
বর্তমানে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি: ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, চায়নিজ ও আরবি। এর মধ্যে বিশ্বে ফরাসি কিংবা রুশ ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা বাংলাভাষীর সংখ্যার চেয়ে বেশি নয়। আরবিভাষীর সংখ্যাও বাংলাভাষীর চেয়ে বেশি কিনা– এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এসব ভাষাও জাতিসংঘে স্থান করে নিয়েছে। অথচ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে বাংলা ভাষার। সময় এসেছে জাতিসংঘের সপ্তম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির দাবি তোলার।
এরই মধ্যে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার আহবান জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয়। একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলাকে জাতিসঙ্ঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আহবান জানান এবং এর স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। ২১ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য বাংলাদেশের দাবিকে সমর্থন করে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করে।
২০১০ সালের ১১ জুন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিধানসভা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য জাতিসংঘকে আহবান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আবারও বিশ্বনেতাদের আহবান জানান। চলতি বছর জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়াও ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাভাষীদের এই দাবিকে সমর্থন করে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে এ ব্যাপারে জাতিসংঘের উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছেন।
সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণেরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আমাদের দাবিটি আমরা ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারি। বিভিন্ন বাংলা ব্লগ ও ফোরামে জনমত গড়ে তুলতে পারি। দেশে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাভাষী খ্যাতনামা লেখকদের এ বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লেখালেখি ও বক্তব্য উপস্থাপনের আবেদন করতে পারি।
বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর, ২০১৬) থেকে বাংলা একাডেমি চত্বরে শুরু হচ্ছে ‘ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল’। চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। এ সাহিত্য উৎসব দেশি-বিদেশি সাহিত্যিকদের মিলনমেলা। ১৮টি দেশ থেকে ৬৬ জন বিদেশি এবং দেড় শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক এ উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। দেশি-বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সরাসরি সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ থাকছে জনসাধারণেরও। আমরা এই ইভেন্টের মাধ্যমে বিদেশী সাহিত্যিকদের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারি, তাদের সমর্থন নিতে পারি।
দেশের ও দেশের বাইরের বাংলাভাষীদের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, রোড শো, স্মারকলিপি প্রদান, ইত্যাদি আয়োজন করতে পারি। এ কাজে বিশেষ করে প্রবাসী ব্লগার ও এক্টিভিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যে কোনো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে লবিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এ কাজের জন্য খ্যাতনামা লবিস্ট নিয়োগ করার জন্য দাবি জানাতে পারি।
সর্বোপরি, যেহেতু এ কাজে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি জানাতে পারি।
মোট কথা, আমরা আরেক দফা একত্রিত হতে পারি। বিশ্ব-দরবারে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি বাঙালির কণ্ঠে উচ্চারিত হোক আমাদের প্রাণের দাবি- বাংলাও হোক জাতিসংঘের ভাষা।
লেখক: সাংবাদিক, ইমেইল: hasanf14@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.