
দীপক শর্মা দীপু,
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজারের মহেশখালি কুতুবদিয়া আসনে কে কে প্রার্থী হচ্ছেন তা নিয়ে শুরু থেকে নাটকিয়তার জন্ম হয়। এ আসনে কে থাকছেন, কে বাদ পড়ছেন, কে আসছেন, কে সরিয়ে দাঁড়াবেন এই নাটকিয়তার শেষ নেই। সর্বশেষ নৌকাকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে পড়লেন ড. আনসারুল করিম। আর সর্বশেষ নির্বাচনে ইন করলেন আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। এখন আবার প্রশ্ন উঠেছে ধানের শীষকে সমর্থন দিয়ে হামিদুর রহমান আজাদও কি সরে পড়বেন? তখন নির্বাচনী ভাবনা আবার অন্যদিকে মোড় নেবে।
আশেক উল্লাহ রফিক এমপির সাথে মহাজোটের মনোনয়ন প্রত্যাশি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগে সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আনাসরুল করিম, ওসমান গনি ও জাতীয় পাটির মুহিব উল্লাহ। অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট থেকে মনোয়ন প্রত্যাশি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রিয় নেতা আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ও জামায়াতের কেন্দ্রিয় নেতা এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
পরে নানা নাটকিয়তার মধ্যে মহাজোট থেকে আশেক উল্লাহ রফিককে মনোয়ন দেয়া হয়। হামিদুর রহমান মামলার কারনে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। ঠিকই ২০ দলীয় জোট থেকে হামিদুর রহমান স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থীতা লাভ করেন। কিন্তু বাদ পড়ে গেলেন বিএনপির আলমগীর ফরিদ ও জাতীয় পাটির মুহিব উল্লাহ।
এই অবস্থায় আশেক উল্লাহ রফিক নৌকা নিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ আপেল নিয়ে আর ড. আনসারুল করিম মাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে পড়েন। এর মধ্যে প্রার্থীতা ফিরে পান জাতীয় পাটির মুহিব উল্লাহ। তিনি নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রচারনায় এত বেশি সক্রিয় লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা।
সর্বশেষ ২০ ডিসেম্বর ড. আনাসরুল করিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে স্বাক্ষাত করে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে পড়েন আর পূর্ণ সমর্থন দেন নৌকার প্রার্থী আশেক উল্লাহ রফিককে। অন্যদিকে গত ১৯ ডিসেম্বর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থীতা ফিরে পান আলমগীর ফরিদ। এতে করে ভোটের হিসাব হিসেব বদলে যায়। নির্বাচনী মাঠেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে।
এছাড়া আশেক উল্লাহ রফিক বনাম আলমগী ফরিদের মধ্যে নির্বাচনের এই লড়াইকে ভোটাররা চাচা ভাতিজার ভোটযুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এবারের নির্বাচন ত্রিমুখী লড়াই হবে এমন মনে করছেন ভোটাররা। সবকিছু মিলে জেলার ৪টি আসনের মধ্যে মহেশখালি কুতুবদিয়ার নির্বাচনকে সবাই বিশেষ দৃষ্টিতে দেখছেন।
ভোটারদের মতে, মার্কা নিয়ে দেরিতে মাঠে নেমেও ধানের শীষের আলমগীর ফরিদ চমক সৃষ্টি করেছেন। বিএনপির কর্মীরা চষে বেড়াচ্ছেন আর সাড়াও পাচ্ছেন। কারণ দীর্ঘদিন পর বিএনপির নেতা কর্মী, সমর্থক ও ভোটাররা মাঠে এসেছে। তারা প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে।
অন্যদিকে আশেক উল্লাহ রফিক উন্নয়নের জয়যাত্রার আহবান জানিয়ে সাধারন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। নৌকার আওয়াজ তুলেছে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। গণফ্রন্ট্রের প্রার্থী হিসেবে ড. আনসারুল করিম মাছ মার্কা নিয়ে মাঠে নামলেও এখন নৌকাকে সমর্থন দেয়ায় বাড়তি ভোটার যোগ হতে পারে নৌকার পালে। কারন বংশগত ঐতিহ্য আর পুরানো আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে ড. আনসারুল করিমের বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ভোটারদের বিরাট একটা অংশ আনসারুল করিমের কারণে নৌকার ব্যালটে যাবে।
২০ দলীয় প্রার্থী হিসেবে এই এইচ এম হামিদুর রহমান প্রথম ধাক্কায় বিএনপি জামায়াতের ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি ধানের শীষ না পেলেও আপেল প্রতীক নিয়ে জামায়াতের ভোট ব্যাংক তার পক্ষে রয়েছেন।
ভোটারদের মতে, আওয়ামী লীগের আশেক উল্লাহ রফিক, বিএনপির আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ও ২০ দলীয় প্রার্থী জামায়াতের নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এই তিন জনই হেভিয়েট প্রার্থী।
আশেক উল্লাহ রফিক বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটারদের মাঝে তার অনেক গুরুত্ব রয়েছে, রয়েছে প্রভাবও। এই নির্বাচনে তার বড় হাতিয়ার হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন। বিশেষ করে মহেশখালি কুতুবদিয়ার ম্যাগা উন্নয়ন। যা বাংলাদেশের কোন আসনে এত বিশাল অংকের বাজেটের উন্নয়ন হচ্ছেনা। মহেশখালি কুতুবদিয়ার এই উন্নয়নে ফিরিস্তি নিয়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হচ্ছে আর এলাকার জনগণও সরকারের উন্নয়নে খুশি। এতে করে আশেক উল্লাহ রফিক নির্বাচনের দৌড়ঝাঁপে বিশেষ সুবিধায় রয়েছে। তা ছাড়া ড.আনসারুল করিম সরে পড়ায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন নৌকার মাঝি আশেক।
তবে অনেক ভোটার জানান, আশেক উল্লাহ রফিক আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। এজন্য তাকে সবাই আলাদা সম্মানে দেখে। কিন্তু রাজাকার বংশধরদের সাথে তার মেলামেশা আর তাদের সাথে নির্বাচনী প্রচার করার কারনে ভোটারদের মাঝে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যারা রাজাকার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল তাদের পরিবার। এতে অখুশি সংখ্যালঘুরাও। এছাড়া দুর সম্পর্কের চাচা ভাতিজা হলেও ভোটে এর প্রভাব পড়বে। ভাগ হয়ে যাবে বংশ ও পরিবারের ভোট।
হামিদুর রহমান আযাদ সাবেক এমপি ও জামায়াতের কেন্দ্রিয় কমিটি সহকারি সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় জামায়াতের নেতা, কর্মী, সমর্থক আর ভোটারদের একচেটিয়া ভোট যাবে আপেল মার্কায়। তিনি কারাগারে থাকায় অনেক ভোটার তার প্রতি মায়া দেখিয়ে ভোট দিতে পারেন। কুতুবদিয়ায় বেশিরভাগ ভোট যাবে হামিদুর রহমান আযাদের ঘরে। আর মহেশখালির ভোট ভাগ হবে চাচা ভাতিজার মধ্যে। এখানের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত জামায়াতের একচেটিয়া ভোট পড়বে আপেল মার্কায়। এ ছাড়া নির্বাচন প্রচারণা প্রচারনায় ও প্রভাব বিস্তার করতে সারাদেশে জামায়াত শিবিরের নেতা কর্মীরা মহেশখালী কুতুবদিয়ার কাজ করছে। এটাও হামিদুর রহমানের আযাদের বাড়তি পাওয়া।
তবে হামিদুর রহমান আযাদ দীর্ঘদিন মাঠে না থাকায় আগের যে জনপ্রিয়তা ছিল তা অনেকটা কমে গেছে। জামায়াতের অনেক সমর্থক ভোটার সুবিধা আদায়ের জন্য আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে ছিলেন। তারা নৌকার জন্য কাজ করছেন। এ ছাড়া বড় সমস্যা হতে নতুন ভোটার। কারণ নতুন ভোটাররা এখনো হামিদুর রহমান আযাদের সাথে ভালো সসম্পর্ক গড়ে উঠেনি।
আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ দুইবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার বিশেষ গুণ হচ্ছে তিনি জনগনের সাথে সহজে মিলে মিশে যেতে পারেন। সবার সাথে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করেন। তার মধ্যে কোন ভাব নেই। সবার সাথে এমনভাবে কথা বলেন যেন সবাই আপনজন। তিনি সংসদ সদস্য না থাকলেও সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। জনগণের সাথে যোগাযোগ ধরে রাখেন। এজন্য মাঠে তার জনপ্রিয়তা আগে থেকেই ছিল। এর বাইরে তিনি বিএনপি নেতা হিসেবে তার ভোট ব্যাংক রয়েছে। দীর্ঘদিন পর বিএনপি নির্বাচনি মাঠে নামতে পারায় এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। তাই নেতা কর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ধানের শীষকে জেতাতে। ভোটারদের মাঝে সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।
তবে তিনিও চাচা ভাতিজার ভোটযুদ্ধে তার বংশ ও পরিবারের ভোট খোয়াতে পারেন। দীর্ঘসময় ক্ষমতায় না থাকার কারনে জনগণের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারায় বর্তমান সরকারে উপকারভোগিদের ভোট হারাবেন। নতুন ভোটাররাও তাকে না চেনার কারনে নতুনদের ভোট অন্যদিকে ধাবিত হতে পারে।
জাতীয় পাটির মুহিব উল্লাহ প্রচারনায় পিছিয়ে রয়েছেন। তিনি যদি কোমর বেধে নির্বাচনে অংশ নিতেন তাহলে তিনিও একজন শক্তিশালী প্রার্থী হতে পারতেন। তাকে গণনা থেকে বাদ দেয়া যেতনা। এখন যেহেতু তিনি যেভাবে নির্বাচনে প্রচারনায় থাকা প্রয়োজন সেইভাবে না থাকায় ভোটাররা তাকে গণনায় রাখজেননা। তাই সবমিলিয়ে মহেশখালি কুতুবদিয়া আসনে মুহিব উল্লাহ ছাড়া অন্য ৩ প্রার্থী হেভিয়েট এবং তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে এমন আশা করছেন ভোটাররা।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.