
ফাইল ফটো
মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আত্মীয়তার সুবাদে ও বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে তারা ঢুকে পড়ছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে। চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি, গোয়েন্দা নজরদারি ও সার্বক্ষণিক টহল ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও তাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, রোহিঙ্গারা যেন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া সম্পূর্ণভাবে ঠেকানো অসম্ভব। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে খুবই অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গাই ছড়িয়ে পড়তে পারছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম মহানগর, ফেনী, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা। এর মধ্যে বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকা থেকে চার রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আনোয়ারুল আজিম। আটক ব্যক্তিরা সীমান্তের ৪৬ পিলারের পাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করার সময় তাদের আটক করা হয় বলে জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বহু বছর ধরেই বাংলাদেশে অবস্থান করছে। নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা পূর্বপরিচিত ও আত্মীয়-স্বজনের কাছেও আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা টাকা খরচ করতে পারছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় পেতে তাদের তেমন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না।
চলছে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ামিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গরা যেন কক্সবাজারের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যাতে যেতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারি বাড়িয়েছে। টহল ও তল্লাশিও চালাচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টে। সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গাদের এই ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এ কে এম ইকবাল হোসেন। তিনি, ‘সব পক্ষ থেকে যদি সার্বিক সহযোগিতা না পাওয়া যায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যাবে না। কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে ৯টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ১২টি পেট্রোল টিম সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি, যেন কেউ কক্সবাজার এলাকা থেকে বের হতে না পারে।’
পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন আরও বলেন, ‘কক্সবাজারের প্রধান সড়ক ছাড়াও সীমান্তের গ্রামগুলোতে পায়ে হাঁটার অনেক ছোট ছোট রাস্তা রয়েছে। পায়ে হেঁটে আসার যে পথগুলো রয়েছে, সেগুলো দিয়ে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন দিকে চলে যায়। তবে পুলিশের তৎপরতার কারণে সেই পরিমাণ অনেক কম। তাছাড়া স্থানীয় বাস মালিক সমিতিকেও বলে দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কক্সবাজারের বাইরে যেতে চাওয়া ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে তবেই টিকিট দেন।’
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোহিঙ্গদের ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও রোহিঙ্গা বিষয়ে বিজিবির স্থানীয় মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজরুল হাসান খান বলেন, ‘পুলিশ, প্রশাসন ও বিজিবি— সবাই মিলে চেষ্টা করা হচ্ছে যেন রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়তে না পারে। তবে এটা পুরোপুরি ঠেকানো অসম্ভব। কারণ, এর আগে ১৯৯১ সালে, ১৯৮২ সালে ও তারও আগেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে। তারা বাংলাদেশে ভালোভাবেই আছেন। যাদের আত্মীয়-স্বজন বাংলাদেশে রয়েছে, তারা তো স্বজনদের কাছে যাবেই। সেটা কিভাবে ঠেকাবেন? তাছাড়া তারা দেখতেও আমার-আপনার মতোই। অনেকেই চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলেন। তারা যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন রঙ ও ভিন্ন ভাষার মানুষ হতেন, তাহলে আমাদের ধরতে সহজ হতো।’
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বলেন, ‘সীমান্তে আমরা শুরু থেকেই কাজ করছি। প্রথমে রোহিঙ্গারা খুব কম এসেছে। তখন তাদের আমরা ধরেছি। আমি নিজেই তখন সীমান্তে দায়িত্ব পালন করেছি। আর এখন বিষয়টি দেখতে হচ্ছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। নারী-শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ যখন আসবে এবং যখন দেখবেন যে তারা অসহায়, তাদের খাবার নেই, তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাদের দাবি অনুযায়ী চরম অত্যাচারের শিকার; তখন আসলে তাদের বুঝিয়ে বলার উপায় নেই। তাদের যদি বুঝিয়ে বলা হয় যে এটা তোমার দেশ নয়, তোমরা এখানে এসো না— এভাবে আসলে তাদের ঠেকানো যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একটা বিউপিতে ৫০ জন লোক আছে। তারা কি পারবেন হাজার হাজার মানুষকে ঠেকাতে? তবে জেলা প্রশাসনসহ সবাই মিলে আমরা চেষ্টা করছি যেন তারা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘সরকার এ পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের একসঙ্গে রাখার দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এজন্য বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারের কয়েকটি উপজেলায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তারা যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো ছাড়াও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।’
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চলে আসছে কয়েক দশক ধরে। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের মুখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে চার লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত ২৫ আগস্টের পর নতুন করে বাংলাদেশে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনও রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র:deshebideshe.com,ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.