
ঘিলা পাড়া এরাকায় এইভাবে হাতি দিয়ে গাছ টানা হচ্ছে। এতে করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে পোষা হাতিগুলো।
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম; লামা :
লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় হাতি দিয়ে গাছ উজাড়ের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় এক ত্রিপুরা যুবকের তথ্য মতে জানা যায় দুর্গমে বৃক্ষ উজাড়ে ব্যবহৃত ১২টি পোষা হাতি রয়েছে। এইসব হাতি দিয়ে বৃক্ষ উজাড়ের কারণে পরিবেশ ধ্বংস ও হাতি মালিকের দুরাচারে অতিষ্ট দুর্গমের বসবাসরত উপজাতিরা। পাহাড়ে অবস্থানরত উগ্রপন্থিদের সাথে হাতি মালিক, গাছ ব্যবসায়ীদের যোগসাজস ও চাঁদা আদান প্রদানের সম্ভাবনার দাবী করছে স্থানীয়রা।
সম্প্রতি উপজেলার সদর ইউনিয়নের এক বাসিন্দা ঈশ্বর চন্দ্র নামের এক ত্রিপুরা যুবকের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, লামা ইউনিয়নের দুর্গম পোপা এলাকায় ১২টি পোষা হাতি রয়েছে। এইসব হাতির মালিক সিলেট মৌলভী বাজার নিবাসী জনৈক মালয় কোম্পানী।
জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে লামা-থানছি, তৎসংলগ্ন আলীকদম উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় সরকারি খাস অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলের বড় বড় বৃক্ষ আহরণে নিয়োজিত রয়েছে এসব হাতি। হাতির মালিকদের সাথে প্রভাবশালী একটি কাঠ ব্যবসায়ী চক্র চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসব করে আসছে। এ চক্রটি পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মোটা অংকের চাঁদা দিয়ে তাদের অবৈধ ব্যবসার কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

হাতি দিয়ে টানা বেশ কিছু দুর্লভ প্রজাতির শিউরি গাছ। ছবি গুলো লামা উপজেলা সদরের লামামুখ এলাকা হতে তোলা।
লামা সদর ইউনিয়নের দুর্গম পানসি পাড়ার এক মুরুং যুবকের সাথে কথা হলে জানা যায়, সদর ইউনিয়নের দুর্গমের ঘিলা পাড়া, পানসি পাড়া, লেংটা ঝিরি, শিলপাজা ও লাইল্যা পাড়া এলাকায় হাতি দিয়ে বড় বড় গাছ টানা হয়। এইসব গাছের একাংশ লামার পোপা খাল দিয়ে নদী পথে উপজেলা সদরে এনে গাড়ীতে করে পাচার হয়। আর বেশীর ভাগ গাছ সরই ইউনিয়নের লুলাইং এলাকা দিয়ে কেয়াজুপাড়া হয়ে লোহাগাড়া দিয়ে পাচার হয়। দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে প্রশাসনের কোন তৎপরতা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
২০০৬ সালে সেনাবাহিনী আলীকদম জোনের অভিযানে লামা বন বিভাগ বেশ কয়েকটি হাতি আটক করেছিল। পরবর্তীতে এনিয়ে মামলা হয় এবং আটককৃত হাতিগুলো ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কে রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের নির্লিপ্ততায় সম্প্রতি প্রভাবশালী ওই গ্রুপটি আবারো তৎপর হয়ে উঠেছে। বিনা অনুমতিতে হাতি রাখা ও হাতি দ্বারা শতবর্ষি নানা প্রজাতির মূল্যবান বৃক্ষ উজাড় করছে।
আরো জানা যায়, চট্টগ্রামের প্রভাবশালী কাঠ ব্যাসায়ী একটি চক্র স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব করছেন। এই গ্রুপটি পাহাড়ের অশ্রেণিভুক্ত ভূমি থেকে শতবর্ষি বিভিন্ন প্রজাতির মা গাছ (মাদার ট্রি) উজাড় করছে। তারা এই কাজে ইলেকট্রিক করাত ব্যবহার করে বিশাল আকারের শত বছর তারো বেশি বয়সী প্রাকৃতিক সৃজিত গর্জন, চাম্পাফুল গাছ কর্তন ও হাতিদ্বারা আহরণ করছে।
লামা সদর ইউনিয়নের দুর্গম দোছড়ি গ্রামের এক বাসিন্দা ঈশ্বর চন্দ্র ত্রিপুরার অভিযোগ করেন, এখনো ওই এলাকায় ১২টি পোষা হাতি রয়েছে। এ থেকে গর্ভবতী একটি হাতি জঙ্গলে নিখোঁজ হয়। হাতির মালিক নিখোঁজ হাতিটি সন্ধান করার জন্য ঈশ্বর চন্দ্র ত্রিপুরাকে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দেয়। ৪৫ দিন তল্লাশি করে কয়েকজন মিলে ঈশ্বর চন্দ্র ত্রিপুরার নেতৃত্বে নিখোঁজ হাতিটি খুঁজে পায়। কিন্তু হাতি মালিক মালয় কোম্পানী পূর্ব প্রতিশ্রুতিমতে সন্ধান দাতাদের কোন ধরণের পারিশ্রামিক দেননি। উপরন্ত স্থানীয় এইসব যুবকদের নামে চাঁদাবাজীর অভিযোগ এনে হুমকী প্রদান করে। ঈশ্বর চন্দ্র ন্যায্য পারিশ্রামিক পাওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ন মহলের কাছে আবেদন করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাতির মালিক মালয় কোম্পানীর সাথে বান্দরবান ও লোহাগাড়া কেন্দ্রিক প্রভাবশালীদের দহরম-মহরম সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে তিনি কারোর তোয়াক্কা না করে লামা উপজেলাসহ সীমানাবর্তী আলীকদম ও থানছি উপজেলার শতবর্ষি বিভিন্ন প্রজাতির মা গাছ (মাদার ট্রি) নির্বিঘ্নে উজাড় করে চলছে।
উল্লেখ্য এসব কর্তনকৃত কাঠসমুহ লামা ও বান্দরবান বন বিভাগের প্রদত্ত নানা জোত পারমিটের অনুবলে পাচার হয়। সরকারি সংরক্ষিত কিংবা অরক্ষিত বনাঞ্চলে বিদ্যমান কোন মাদার ট্রি কর্তন, আহরণ বন আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধি। কিন্তু লামা-আলীকদম ও থানছি উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ের (সরকারি খাস-অরক্ষিত) প্রাকৃতিক সৃজিত শতবর্ষি- গর্জন, চাপাফুল সহ মা গাছ কর্তন ও আহরণ হরদম চলছে। দুর্গম ওইসব এলাকার পাহাড়ে কর্তনকৃত গাছের গোড়ালি গুলোই প্রমান করবে কিভাবে উজাড় হয়েছে শতবর্ষি বৃক্ষরাজি। এ ব্যাপারে হাতির মালিক মালয় কোম্পানীকে ফোন করা হলে, তিনি সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে চাননি।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেহেতু সংরক্ষিত বনাঞ্চল নয়, সেহেতু বিষয়টি আমাদের এখতিয়ারে পড়েনা। যদি লামা নদী পথে এসব গাছ আনা হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের লোকজন তা জব্দ করবে। পোপা ও লুলাইং মৌজায় যেখানে হাতি রয়েছে, দুর্গম এলাকা হওয়ায় বন বিভাগের পক্ষে কোন ব্যবস্থা নেয়া কষ্টসাধ্য। অশ্রেণিভুক্ত বন উজাড় বন্ধে জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাস কিংবা অশ্রেণিভুক্ত বন রক্ষায় জেলা প্রশাসনের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে।
লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর এ জান্নাত রুমি বলেন, বিনা অনুমতিতে হাতি দ্বারা গাছ আহরণ কিংবা হাতি রাখা আইনত দন্ডনীয়। তিনি বলেন হাতি সংক্রান্ত বিষয়ে কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.