
বালুখালী ও কুতুপালংয়ে বন ওপাহাড় উজাড় করে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মাণ করা হয় বসতি
হুমায়ুন কবির জুশান; উখিয়া :
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সদিচ্ছা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। দেশের ভেতরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি চেষ্টা করবে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে ও বড় ধরনের কোনো বিধিনিষেধ আরোপ ঠেকাতে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া এখনো দেশটির পক্ষে থাকায় মিয়ানমার সংকট সমাধানে আন্তরিক নয়।
গত বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) উখিয়ায় সুশীল সমাজের সাথে মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে চট্রগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো: আব্দুল মান্নান বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সংকট সমাধানে দেশটির সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। তারা বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা লিখতে বারণ করেছে, আমরা বলেছি ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের ঘটনায় কী তারা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছেন? না, এদেরকে বলপ্রয়োগ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দমন অভিযান চালিয়ে ক্ষুধার্ত, নি:স্ব, আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা সেদিন মাতৃভূমি রাখাইন রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা রোহিঙ্গা নেতা মোরশেদ আলম বলেন, সেই সময় পশ্চিম রাখাইনে বাজার বন্ধ করে দিয়ে খাবারের সংকট সৃষ্টি করে। পাশাপাশি স্থানীয় বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে হামলা চালিয়ে আগুন দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। হেলিকপ্টার থেকে দাহ্য পদার্থ ফেলেছে মিয়ানমার সেনারা। বাংলাদেশে আসার পথে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গারা নিহত হয়েছেন।
তাছাড়া একইভাবে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আসার পথে নৌকাডুবে শত শত রোহিঙ্গা নারী ও শিশু নিহত হয়েছেন। আমি আমার বৃদ্ধ বাবাকে কাঁধে করে খেয়ে না খেয়ে তিন দিন পর বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। সেই সময়ের বিভিষিকাময় দিনগুলির কথা মনে হলে আমরা চরম অসহায়ত্ববোধ করি। মরিয়ম বেগম নামের ৭৫ বছর বয়সী এক বয়োবৃদ্ধ নারী (২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের তিন দিন পর) বাংলাদেশে প্রবেশ করেন মিয়ানমারের বুচিদং এলাকা থেকে।
তিনি জানান, বুচিদং গ্রাম ছেড়ে লম্বাবিল পাড়ি দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে কর্দমাক্ত শরীর নিয়ে পাঁচ দিনে তিনি ছেলের সহযোগিতায় উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এসে পৌঁছান। নিজের চোখের সামনে বার্মিজ আর্মিদের গুলিতে স্বামী ইব্রাহীমের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। এছাড়া নাতনি সুমাইয়াকে মিয়ানমারের মিলিটারিকে আছড়ে মেরে হত্যা করতে দেখেন চোখের সামনে। তার চোখের সামনে ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন। ছেলের সহায়তায় কোনোমতে পালিয়ে আসেন তিনি। শুধু মরিয়ম বেগমই নন, তার মতো আরও অনেকেই হারিয়েছেন স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের। বার্মিজ আর্মি ছাড়াও বিজিপি, নাসাকা বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা এ হত্যাযঞ্জ চালিয়েছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে সে দিন যারা ফিরেছিলেন, তাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ, ক্ষুধার্ত ও জীর্ণশীর্ণ চেহারায় বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান নিয়েছিলেন।
মিয়ানমারের বুরাইঙ্গা পাড়া থেকে আসা ইয়াছমিন সুলতানা নামের এক যুবতী অকপটেই জানালেন, সেখানকার করুণ কাহিনী। বললেন তার গ্রামে বৃদ্ধা ও তরুণীদের পৃথক লাইনে দাঁড় করানো হয়েছিল। সেখানে তরুণী যুবতীদের আলাদা একটি বাড়িতে নিয়ে বার্মিজ আর্মিরা গণধর্ষণ করেছে। তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তবে শুধু ধর্ষণই নয়, তার সামনেই তিন তরুণীকে গুলি করে হত্যাও করা হয়। প্রত্যেক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ যারা ক্যাম্পে আছেন তারা তাদের ২৫ আগস্টের করুণ ইতিহাস বলার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসাও করেছেন।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.