
কবি রজনীকান্ত সেনের লেখা ‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,/ কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।’— অমর এক কবিতার লাইনগুলো নিশ্চয়ই আজো সবার মনে আছে। পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকা কবিতাটি পড়ে শিক্ষার্থীরা বাবুই পাখি ও বাবুই পাখির শিল্পনিপুণতার কথা জানতে পারলেও মানুষের অসচেতনতায় আজ বাবুই পাখি ও এদের বাসার অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
বাবুই ‘Ploceidae’ গোত্রের অন্তর্গত একদল প্যাসারাইন পাখি। এরা খুব সুন্দর বাসা বোনে বলে ‘তাঁতি পাখি’ (Weaver Bird) নামেও পরিচিত। এদের বাসার গঠন বেশ জটিল হলেও আকৃতি খুব সুন্দর। কয়েক প্রজাতির বাবুই একাধিক কক্ষবিশিষ্ট বাসা তৈরি করতে পারে। তুতির সঙ্গে এরা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এরা মূলত বীজভোজী পাখি। এদের ঠোঁটের আকৃতি বীজ ভক্ষণের উপযোগী; চোঙাকার আর গোড়ায় মোটা। অধিকাংশ বাবুই প্রজাতির আবাস সাব-সাহারান আফ্রিকায়, তবে কয়েকটি প্রজাতি এশিয়ায় স্থায়ী। বাবুই পাখি সারা বিশ্বে ১১৭ প্রকার। তবে বাংলাদেশে ৩ প্রজাতির বাবুই পাখি দেখা যায় : দেশি বাবুই (Ploceus philippinus), দাগি বাবুই (Ploceus manzar) ও বাংলা বাবুই (Ploceus bengalensis)। তবে বাংলাদেশে বাংলা ও দাগি বাবুই-এর প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং দেশি বাবুই এখনো দেশের সব গ্রামের তাল, নারকেল, খেজুর, রেইনট্রি গাছে দলবেঁধে বাসা বোনে। এরা সাধারণত মানুষের কাছাকাছি বসবাস করে, তাই দেখা যায় এদের বাসা মানুষের হাতের নাগালের মাত্র ৫-৬ ফুট উপরে।
বাবুই বেশ দলবদ্ধ প্রাণী; এরা কলোনি করে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। একই গাছে অনেকগুলো বাসা বাঁধে এই পাখি। বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। বাসা করার জন্য বাবুইয়ের প্রয়োজন হয় নলখাগড়া ও হোগলার বন। এরা সাধারণত খুটে খুটে বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, ভাত, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। গ্রীষ্মকাল এদের প্রজনন ঋতু। তারা সাধারণত কাটা জাতীয় বৃক্ষে বাসা তৈরি করে এবং আহার সংগ্রহে সুবিধা হয় এমন স্থান নির্বাচন করে। বেশিরভাগ বাবুই প্রজাতির পুরুষ সদস্য বেশ উজ্জ্বল রঙের হয়। কিছু প্রজাতি তাদের প্রজনন মৌসুমে বর্ণের ভিন্নতা প্রদর্শন করে।
কথিত আছে, রাতে বাসায় আলো জ্বালার জন্য বাবুই পাখি জোনাকি পোকা ধরে এনে বাসায় গোঁজে এবং সকাল হলে জোনাকি পোকাদের আবার ছেড়েও দেয়। বাবুই পাখির বাসা দেখতে একদম উল্টানো কলসির মতো। বাসা বানানোর জন্য বাবুই পাখি খুব পরিশ্রম করে। ঠোঁট দিয় ঘাসের আস্তরণ সারায়। যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে (পালিশ করে) গোল অবয়ব মসৃণ করে। এদের তৈরি খড়কুটোর বাসা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও মজবুত হয় এবং প্রবল ঝড়েও তা পড়ে না। বাবুই পাখির শক্ত বুননের বাসা শিল্পের অনন্য সৃষ্টি, যা একজন মানুষের কাছে সহজে টেনে ছেঁড়া সম্ভব না। বাসা তৈরির শুরুতে বাসায় দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকলেও পরে একদিক বন্ধ করে বাবুই পাখিরা তাতে ডিম রাখার জায়গা তৈরি করে। অপর দিকটি লম্বা করে তৈরি করে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ।
বাবুই পাখি বাসা তৈরি করার পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে পুরুষ বাবুই পাখি স্ত্রী বাবুই পাখিকে সাথী বানানোর জন্য ভাব-ভালোবাসা নিবেদন করে এবং বাসা তৈরির কাজ অর্ধেক হতেই স্ত্রী বাবুইকে কাঙ্ক্ষিত বাসা দেখায়। কারণ বাসা পছন্দ হলেই কেবল এদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকি কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুই পাখির সময় লাগে মাত্র চার থেকে পাঁচদিন। পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে ৫-৬টি বাসা তৈরি করতে পারে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণায় পুরুষ বাবুই পাখি মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন বাসা তৈরির কাজ শেষ করে। তবে প্রেমিক বাবুই পাখি যতই ভাব-ভালোবাসা প্রকাশ করুক না কেন, প্রেমিকা বাবুই পাখির ডিম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেমিক বাবুই পাখি আবার খুঁজতে থাকে অন্য সঙ্গী।
দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জনপদেই প্রায় বিলুপ্তির পথে প্রকৃতির বয়নশিল্পী বাবুই পাখি ও এদের বাসা। আগের মতো এখন আর প্রকৃতিপ্রেমীদেরও চোখে পড়ে না বাবুই পাখি, চোখে পড়ে না বাবুই পাখির তৈরি দৃষ্টিনন্দন ছোট্ট বাসা ও বাসা তৈরির নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য। একসময় দেশের বিভিন্ন জনপদে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সারি সারি উঁচু তাল, খেজুর ও নারকেল গাছের পাতার সঙ্গে বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা দেখা যেত। কালের বিবর্তনে এখন তা আর সচরাচর চোখে পড়ে না। বর্তমানে যেমন তালগাছসহ বিভিন্ন গাছ নির্বিচারে নিধন করা হচ্ছে। তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখিও।
বলা যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন বাবুই পাখি ও তাদের নিজের তৈরি বাসা আজ বিলুপ্তপ্রায়। এ ছাড়া অনেক অসচেতন মানুষ এদের বাসা ভেঙে ফেলে আর এ কারণেও এদের সংখ্যা রহস্যজনকভাবে কমে গেছে। একশ্রেণির মানুষ অর্থের লোভে বাবুই পাখির বাসা সংগ্রহ করে ধনীদের কাছে বিক্রি করছে। এই বাবুই পাখির বাসা শোভা পাচ্ছে ধনীদের ড্রইং রুমে। বাবুই পাখির এ শৈল্পিক নিদর্শনকে টিকিয়ে রাখার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
সূত্র: sonalinews.com – ডেস্ক।
coxview.net Bangla News Portal with Objectivity to spread worldwide "In Search of Truth at Every Moment"


You must be logged in to post a comment.